Main Menu

এবারের রমজান যেরকম কষ্টে কাটছে ইউক্রেনের মুসলিমদের

নিউজ ডেস্ক:
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত আছে। দেশটিতে হামলার দেড় মাস হলেও থামার কোন লক্ষণ নেই। এরই মধ্যে ৪০ লাখেরও বেশি ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত কিংবা আহত হয়েছে। চলমান এই যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

এছাড়াও দেশটির বিভিন্ন শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রই মধ্যে দেশটিতে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ভয়ঙ্কর তথ্যও উঠে এসেছে। ইউক্রেনে পশ্চিমাদের অস্ত্র সহায়তার ঢল অব্যাহত রয়েছে।

যুদ্ধের এই সময়ে বিশ্বজুড়ে চলছে রমজান মাস। ইউক্রেনেও রয়েছে মুসলিমদের বসবাস। এই রমজানে তারা কিভাবে রোজা রাখছেন, ইফতার করছেন। আর ইবাদতই বা কিভাবে করছেন। ঈদ নিয়ে তাদের ভাবনা কি। এমন সব প্রশ্নের উত্তর উঠে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

ইউক্রেনের জনগণের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ মুসলিম, বেসরকারি হিসেবে অনুমান করা হয়, মুসলিমদের সংখ্যা হয়তো এক শতাংশের কাছাকাছি হবে। গত দুটি রমজানে তারা কোভিড মহামারির কারণে সেভাবে কোন উৎসব করতে পারেননি। তাই এবার খুব আগ্রহ নিয়ে রমজানের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এবার যুদ্ধের কারণে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

ইউক্রেনের মুসলিম ভিক্টোরিয়া বলছেন, সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারটা হচ্ছে নিজেকে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক-ভাবে প্রস্তুত করা। আমার আরও বেশি করে কোরআন পাঠ করা দরকার, আরও বেশি সময় ধরে নামাজ পড়া দরকার। কিন্তু এখন ইবাদতে মন দেয়া খুব কঠিন, কারণ আমরা যেরকম মানসিক চাপ আর অবসাদের মধ্যে আছি।

আরেক মুসলিম নিয়ারা এই রমজানে তার শিশু কন্যাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, সে কারণে তিনি রোজা রাখছেন না। তবে ভিক্টোরিয়া রোজা রাখছেন। কিন্তু দুজনেই এবারের রমজানে ধর্মকর্মে মন দিতে বেশ সমস্যায় পড়ছেন।

তিনি বলেন, আমরা নামাজ পড়ার জন্য হয়তো সময় ঠিকই বের করে নিচ্ছি। যুদ্ধের কারণে এক্ষেত্রে আমাদের জন্য কিছুটা মাফ আছে। দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যদি পড়তে না পারি, সেটা হয়তো পরে কাজা করা যায়, দিনেরটা সন্ধ্যায়, বা সন্ধ্যারটা রাতে আদায় করতে পারি। এভাবে আমরা আমাদের ধর্মীয় ফরজ অন্তত রক্ষা করতে পারি

গত আট বছর ধরে নিয়ারা ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় যাপোরিঝিয়া শহরে থাকেন। সেখানে তিনি একটি এনজিও চালান, যেটি পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো বা মুসলিমদের ব্যাপারে গৎবাঁধা ভুল ধারণা দূর করতে নানা ধরণের কর্মসূচি নিয়েছে।

তার চতুর্থ সন্তানের জন্ম হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই পুরো-দমে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। নিয়ারা এবং তার পরিবার তখন রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে সাজানোর কথা ভাবছিলেন।

নিয়ারা বলেন, আমরা একটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছিলাম। বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ছিল, তেলের গুদামে আগুন জ্বলছিল.. রুশ সেনারা শহরের খুব কাছে চলে আসছিল। তখন আমরা সেখান থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।’

রাশিয়া যখন ক্রাইমিয়া দখল করে নিয়েছিল, তখন সেটা প্রায় রক্তপাতহীন ভাবেই করতে পেরেছিল। কিন্তু এবারের অভিযান একেবারে নির্মম, চারিদিকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে।

কাজেই এবার তাদের আবার ঘর ছেড়ে পথে নামতে হলো। এবার তারা চলে গেলেন পশ্চিম ইউক্রেনের চেরনিভিটসিতে। এই বিষয়টি তার সন্তানদের ওপর বেশ মানসিক চাপ তৈরি করেছিল।

‘আমার ছেলে-মেয়েরা ওদের বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওদের নিজের বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। আমরা এমনকি এই শহরেও নিরাপদ নই। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা যে কোন সময় ইউক্রেনের যে কোন শহরে এসে পড়তে পারে।

প্রথমে তারা এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি মসজিদে। পরে অবশ্য তারা একটি আলাদা বাসা ভাড়া নিতে পেরেছেন। রমজানের পুরোনো স্মৃতি যখন তার মনে পড়ছিল, তখন বুঝতে পারছিলেন, কী হারিয়েছেন তিনি।

‘পুরো পরিবার একসঙ্গে রোজা রাখতো, নামাজ পড়তো, এক সঙ্গে ইফতার করে রোজা ভাঙ্গতো। এখন তো আমাদের পরিবারও বিচ্ছিন্ন, যুদ্ধের কারণ একেকজন একেক জায়গায়। অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছে, একেকজন একেক দেশে। আমরা মোটেই সুখে নেই’, বলছেন নিয়ারা।

নিয়ারার স্বামী একজন ইমাম হিসেবে কাজ করেন একটি মসজিদে। এটিকে মসজিদ বলা ঠিক হবে না, একটা ঘরকে ঠিকঠাক করা হয়েছে নামাজ পড়ার জন্য। চেরনিভিটসিতে এখন রাতে কারফিউ জারি থাকে। ফলে অনেক সময় তার স্বামীর দেরি হলে তাকে রাতে মসজিদেই থেকে যেতে হয়। তবে এই নতুন অচেনা জায়গাতেও কিছু মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে নিয়ারার।

‘আমরা এখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্য মানুষদের সঙ্গে একসাথে ইফতার করি। আমরা পরস্পরকে সাহায্য করি। আমরা ধনী মুসলিমদের প্রতি আবেদনও জানাচ্ছি যেন তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া লোকজনকে খাবার দিয়ে সাহায্য করেন।

ইউক্রেনে হালাল মাংসের অভাবে সংকটে পড়েছেন ইউক্রেনের মুসলিমরা।

দেশটির মুসলিমরা বলেন, আমরা সচরাচর যে ধরনের খাবার খাই, সেরকম খাবারই রান্না করার চেষ্টা করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে হালাল মাংস পাওয়া যায় না। মাঝে মধ্যে কিছু হালাল মুরগী পাওয়া যায়। তুরস্কের মতো কিছু দেশের মুসলিম ত্রাণ সংস্থাগুলো কিছু প্রয়োজনীয় খাদ্য সাহায্য পাঠায়। এর পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিমরা কিছু রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন দিয়ে সাহায্য করে।

আমরা হিমায়িত মাংস এবং মাছ দিয়ে কোন রকমে রান্না চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের ভাষ্য, আমরা হালাল খাবারই দেয়ার চেষ্টা করি। তবে হালাল মাংসের সরবরাহ নেই, তাই আমরা সমস্যায় আছি। যেসব মুসলিম দুর্গম বা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আছেন, তারা হিমায়িত হালাল মাংসও পাচ্ছেন না। হালাল সার্টিফিকেট দেয় কিয়েভের যে সংস্থা, যুদ্ধ শুরুর আগে ভিক্টোরিয়া সেখানে পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি আশা করছেন হালাল মাংসের সমস্যার মোকাবেলা শিগগির করা যাবে।

এদিকে অনেক মুসলিম নারী-পুরুষ ইউক্রেনের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে এবং আধা সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন। কেউ কেউ সম্প্রতি তৈরি হওয়া সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।

রমজানে অনেক মুসলিম মানবিক সাহায্য সহযোগিতা দিচ্ছেন। লোকজনকে উদ্ধার করতে চাঁদা তুলছেন সৈনিকদের জন্য সামরিক সাজ-সরঞ্জাম কিনে দিতে।

স্থানীয়রা বলছেন কিয়েভের যেটা প্রধান মসজিদ, সেখানে স্বাভাবিক সময়ে যত মানুষ নামাজ পড়তে আসে, এখন আসছে তার মাত্র ৫ শতাংশ। এখনো অনেক শহরে আছে মুসলিমরা আছে। তবে তারা অত্যাবশ্যকীয় নানা সেবা দেয়ার কাজে বা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কাজে ব্যস্ত, সেজন্যে তারা হয়তো নামাজ পড়তে মসজিদে আসতে পারছেন না।

দেশটির মুসলমানরা বলছেন, আমাদের লোকজনকে সাহায্য করার জন্য যতটা সম্ভব আমাকে কাজ করে যেতে হবে। দেশপ্রেমিক হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। ইউক্রেনের জনগণের মূল শক্তি হচ্ছে এর জনগণের ঐক্য। আমাদের অবশ্যই একসঙ্গে থাকতে হবে, একে অপরকে সাহায্য করতে হবে। তখনই কেবল আমরা শত্রুকে পরাজিত করতে পারবো।

তারা মনে করেন, এই কঠিন দুঃসময়ে ধর্মবিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধটা আসলে আল্লাহর একটা পরীক্ষা। আমরা বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি, আমরা শান্তির জন্য প্রার্থনা করছি, শান্তির অপেক্ষায় আছি।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published.