Main Menu

সিলেটে ৫ বছর ধরে মাটির নিচ থেকে ওঠছে না পাথর

রেজাউল হক ডালিম, অতিথি প্রতিবেদক:
সিলেটে স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম উৎস পাথর। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যেরর কারণ দেখিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর যাবত সিলেটের কোয়ারিগুলোতে বন্ধ রাখা হয়েছে পাথর উত্তোলন। এতে করে চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন সিলেট ও সুনামগঞ্জের ৫ উপজেলার ১০ লক্ষাধিক পাথর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী।

একইসাথে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। সর্বশেষ গত বছর সিলেটের ৩টি কোয়ারি ৬ ম সের জন্য যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে পথর উত্তোলনের শর্তে খুলে দেন হাইকোর্ট। কিন্তু জেলা প্রশাসনের অসহযোগিতায় ওইসময় খুব একটা পাথর উত্তোলন করতে পারেননি শ্রমিকরা। এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন।

 

তবে সম্প্রতি শুধু কোম্পানীগঞ্জর ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে সনামন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পেয়ে শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় কোয়ারিগুলো খুলে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে মিছিল-মিটিং, আবেদন-নিবেদন, সংবাদ সম্মেলনসহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পাথর সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, অপরিকল্পিতভাবে ও যন্ত্রের সাহায্যে পাথর উত্তোলনের ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দির পরিবেশ। এরই মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত জাফলংকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, এসব কোয়ারি থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাথর তুলতে গিয়ে নিয়মিতই ঘটে প্রাণহানি। গত চার বছরে মারা গেছেন ৮০ জনের মতো শ্রমিক।

প্রাণ ও পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন টিলা, বিছনাকান্দি ও লোভছড়া- এ পাঁচ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে ২০১৭ সালের কিছুদিন এবং গত বছরের শুরুতে এ পাঁচ কোয়ারির মধ্যে জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দিতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেন উচ্চ আদালত।

পৃথক দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৫ জানুয়ারি জাফলং, বিছানাকান্দি ও ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা ছয় মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদেশে কোনো যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে ও জাফলংয়ের পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) বাইরে থেকে পাথর উত্তোলন করতে বলা হয়।

এর আগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোয় যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন উচ্চ আদালত। তবে এমন নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্যবসায়ীরা বোমা মেশিন ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করতেন। প্রশাসনের অভিযানে নিয়মিত এ রকম যন্ত্র জব্দ করা হতো।

এদিকে, স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম ভান্ডার পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় সিলেটের পাথর সংশ্লিষ্ট প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছে। কর্মহীন মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপনের চরমসীমায় উপনীত। তাছাড়া দেশিয় প্রাকৃতি সম্পদ রেখে অর্থ দিয়ে কিনে বিদেশ থেকে পাথর আমদানি করে নির্মাণ, স্থাপন ও মেরামত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অভিযোগ উঠেছে- দেশে উন্নতমানের পাথর রেখে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের মুদ্রা অপচয় করে নিম্নমানের পাথর আমদানির নামে দেশির মুদ্রা পাচার করা হচ্ছে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিবেশসম্মতভাবে পাথর আহরণের সুযোগ করে দেওয়ার জোর দাবি পাথর সংশ্লিষ্টদের।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পাথর আহরণ এবং বিপণন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়ায় সিরেট ও সুনামগঞ্জের ৫ উপজেলা- কোম্পানীগঞ্জ, জাফলং, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও ছাতকের বৃহৎ জনগোষ্ঠী অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হওয়ার পাশাপাশি পাথর বিপণনের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্টোন ক্রাশার, মিল মালিক, পাথর ব্যবসায়ী, ট্রাক-ট্রাক্টর শ্রমিক, বার্জ, কার্গো, নৌকা মালিক শ্রমিক, পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

অপরদিকে, সিলেটের এ পাথরের গুণগতমান উন্নত হওয়ায় দেশের নির্মাণ শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে এ পাথর ব্যবহার হয়ে আসছিল। বুয়েট, শাহজালাল ইউনির্ভাসিটিসহ দেশের সব প্রকৌশল সংস্থার মান বিবেচনায় এ পাথরের গুণগতমান এশিয়া মাহাদেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মনোনীত হওয়ায় নির্মিত অবকাঠামোর মজবুত ও স্থায়িত্ব সর্বজন বিদিত। খরস্রোতা প্রবাহিনীর ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত এ অঞ্চলে প্রতিবছর উজান থেকে প্রকৃতিগতভাবে লাখ লাখ টন পাথর নেমে এসে কোয়ারি অঞ্চল পরিপূর্ণ হয় এবং এ পাথরই শ্রমিকরা উত্তোলন করে দেশের নির্মাণ শিল্পে যোগান দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পাথর কোয়ারিগুলোর পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় হাজার হাজার ক্ষদ্র ব্যবসায়ী পড়েছেন বিপাকে। অনেকে ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, সনাতন পদ্ধতিতে পাথর আহরণের শর্তে কোয়ারিগুলো খুলে দেওয়ার জন্য কিছুদিন আগে সিলেট জেলা প্রশাসক বরাবরে ডিও লেটার দিয়েছেন সিলেট-৪ আসনের এমপি- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় মন্ত্রী ইমরান আহমদ। কিন্তু সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সভাপতি গোলাম হাদী ছয়ফুল বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে ২০১৬ সাল থেকে সিলেটের সবকটি পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছুদিনের জন্য খুলে দেওয়া হলেও এখনও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কোয়ারিগুলো। সম্প্রতি কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে সনামন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন দিয়েছেন আদালত। কিন্তু সে আদেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতায়। তিনি বলেন, মূলত পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে একটি চক্রের ইন্ধনেই দেশীয় এ সম্পদ আহরণ বন্ধ রেখে নিম্নমানের বিদেশি পাথর আমদানি করা হচ্ছে। আমরা পাথর উত্তোলনের জন্য দাবি-দাওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি আমরা।

তবে পাথর কোয়ারির বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা নেই উল্লেখ করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের সুপারিশের বিষয়ে কিছু জানা নেই। আর এ বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনাও আসেনি। খুলে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা আসলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি পরিবেশ বিনষ্টকারী যন্ত্র যাতে ব্যবহার না হয় সেদিকে নজরদারি রাখা হবে।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published.