Main Menu

এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

নিউজ ডেস্ক:
২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার পরিমাণ ১শ ছাড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে।

অনার্স পড়ুয়া তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি। এসব শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার নিয়ে সামাজিক চাপ বেশি থাকে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে তাদের মাঝে হতাশার প্রভাব বেশি দেখা যায়।
আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েছে আত্মহত্যা; হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষার্থীরা’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার (২৯ জানুয়ারি) এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের পরিচালক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান, জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।

প্রায় অর্ধশতাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা থেকে সমন্বয় করা আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে এবার উঠে এসেছে বেশ কিছু ভয়াবহ তথ্য। জরিপের তথ্যমতে, এক বছরে এত বেশি সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা এবারই প্রথম।

২০২১ সালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সমন্বয় করে দেখা গেছে, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মাঝে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০১টি। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে, যা ৬১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বা ৬২ জন।

এছাড়া মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটি ১২, যা মোট আত্মহননকারীর ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যাটি চার, যা মোট আত্মহত্যাকারীর তিন দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ২২ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩ জন।

 

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে কম আত্মহত্যা করেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আত্মহত্যার ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা, যার সংখ্যা নয়জন। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যাটি ছয়জন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচজন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যাদের সংখ্যা তিনজন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন আত্মহননের হার নিঃসন্দেহে ভীতিকর।

আত্মহননকারীদের বয়সভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২২-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। সমন্বয় করা তথ্যগুলোর মধ্যে ৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে, যা মোট ঘটনার ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৮-২১ বছর বয়সী তরুণদের আত্মহত্যার ঘটনা মোট সমন্বয় করা ঘটনার ২৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ২৭ জন। এছাড়া ২৬-২৯ বছর এবং ২৯ বছরের উর্ধ্বে এই হার যথাক্রমে নয় দশমিক ৯০ শতাংশ এবং তিন দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা সংখ্যায় যথাক্রমে ১০টি ও চারটি।

সাধারণত নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা গেলেও এবারের পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতবছর আত্মহত্যাকারীদের একটা বড় অংশই ছিল পুরুষ শিক্ষার্থী। সর্বমোট ৬৫ জন পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৬৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

অন্যদিকে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ছিল ৩৬ জন বা ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, পুরুষ আত্মহত্যাকারীদের সংখ্যা নারীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। করোনার মধ্যে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়ে যাওয়া পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

মাসভিত্তিক আত্মহত্যা প্রবণতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে এই হার সবচেয়ে বেশি ছিল, যা সমন্বয় করা ঘটনার ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা ১৫ জন। সবচেয়ে কম ছিল এপ্রিল মাসে যা এক দশমিক ৯৮ শতাংশ বা দুই জন। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের চেয়ে শীতকালে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা যায়।

আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, অনার্স পড়ুয়া তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি, যা ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এসব শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার নিয়ে সামাজিক চাপ বেশি থাকে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে তাদের মাঝে হতাশা প্রভাব বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে সম্পর্কের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে এ পথে ধাবিত হয়েছেন ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। দুঃখজনক হলেও সত্যি পড়াশোনা সংক্রান্ত কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং আর্থিক সমস্যায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন চার দশমিক ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।

সমন্বয় করা তথ্য থেকে আরও দেখা যায়, মাদকাসক্ত হয়ে আত্মহননের বেছে নিয়েছেন এক দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া আরও নানা কারণে আত্মহত্যা করেছেন মোট ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে না পারাকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি বলেন, পত্রিকা বিশ্লেষণ করে আত্মহত্যার কারণগুলো বাইরে থেকে যতটা দেখা যাচ্ছে, সমস্যা তার চেয়েও গভীর। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয় শিক্ষার সুযোগ অপর্যাপ্ত থাকায়, তাদের জীবনে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে তারা সেটা সামলাতে পারে না। প্রেমে বিচ্ছেদ হলে তারা যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি পরীক্ষার খারাপ ফলও তাদের আশাহত করে। আমরা যদি তাদের শেখাতে পারি যে ভালো-মন্দ যাই ঘটুক না কেন, সেটা জীবনেরই অংশ এবং আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে তাদের ধৈর্য্যশীল হতে হবে। ফলশ্রুতিতে এই শিক্ষার্থীরা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। পাশাপাশি সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবমুখী কিছু জ্ঞান যেমন- আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ক্যারিয়ার দক্ষতা ইত্যাদি আত্মহত্যা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এখনই পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরবর্তীকালে আমাদের অনুশোচনা করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় দায়িত্বশীলদের অবদান রাখার সঠিক সময় এখনই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যা বাড়ার প্রেক্ষিতে ঢাবির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, কোভিড পরিস্থিতিতে এ বিষয়ের পরিসংখ্যান এবং তার ফলাফল যথেষ্ট ভীতিকর। কোভিড-১৯ নিয়ে আমরা যতখানি আতঙ্কিত, আত্মহত্যায় মৃত্যুবরণ করা অসংখ্য মানুষ নিয়ে আমরা ততোটা চিন্তিত নই। সমীক্ষা বলছে, শিক্ষা সংক্রান্ত যেমন- পড়াশোনার চাপ, বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পরিবারের সঙ্গে অভিমান, প্রেমঘটিত সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ইত্যাদি নানাবিধ কারণ আত্মহত্যার জন্যে দায়ী।

তিনি আরও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য এই মৃত্যুর মিছিলে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ-তরুণী সামিল হবেন, যেহেতু মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমি বিশ্বাস করি যদি সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা যায় এবং প্রতিটি জেলায় আত্মহত্যা সেল গঠন করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো যায়, অনেকাংশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমি আশাবাদী যে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে আমরা এটা নিয়ে একটি দিক-নির্দেশনা তৈরি করতে পারবো।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধ নিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সামিরা আক্তার সিয়াম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করলে এসডিজি এবং লিগ্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট সম্পর্কিত কৌশল বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রস্তাবনা:

১. প্রতিটি জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনাল নিয়োগ দেওয়া এবং ইয়ুথ অর্গনাইজেশনকে যথাযথ ট্রেনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

২. পলিসি ডায়ালগে তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পুরোপুরি দেশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আত্মহত্যার হার কমিয়ে আনা সম্ভব।

৩. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা।

৪. মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ট্যাবু ও হীনমন্যতা দূরীকরণে প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।

৫. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহে জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় হটলাইন সেবা চালু করা।

৬. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সরকার একটি বিশেষ অ্যাপস চালু করতে পারে যেন যে কেউ দ্রুত মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারে।

৭. প্রান্তিক পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তরুণদের মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড ট্রেইনিং সরবরাহ করা।

৮. শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যথাযথ ক্যাম্পেইন আয়োজন করা।

৯. সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা জোরদার করা।

১০. মানসিক চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ ফি ও ওষুধের দাম কমানো।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published.